ওপারেই ভালো আছো বাবা-মা তোমরা

সেদিন সকালটা ছিলো প্রানের উম্মাদনায় ভরপুর। আকাশ ছিলো আষাঢ়ের কালো মেঘের উদভ্রান্ত রুপ।প্রানের উচ্ছাসে মেঘের দেশে যাত্রী হতে মন বার,বার উদ্বেলিত হচ্ছিল। সামান্য সূর্য্যের আলোক ছায়া বিকশিত।চায়ের কাপে চুমুক দিতে,দিতে মেঘমালার কিঞ্চিত আবির্ভাব অনুভব করলাম।

আস্তে, আস্তে ঝড়ার আগমনি ঝংকারে চারিদিক মুখরিত সঙ্গে বদ অভ্যাসের কর্মটিও চলছে।হাতে মোবাইল, জাতীয় দৈনিকের হেডলাইন গুলোতে চোখ রাখতে লাগলাম।হঠাৎ একটা শিরোনামে চোখ আটকে গেলো।

পিতার লাশ সাতাশ ঘন্টা উঠানে পরে আছে, আর সন্তানরা তার সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত। 

অবশেষে স্থানীয় জনপ্রতিনীধির হস্তক্ষেপে সব সন্তানেরা বাবার দাফন করার সম্মতি দিলেন।কিন্তু বাধ সাধলেন বড়ো সন্তান। তিনি পুলিশে ফোন দিলেন।পুলিশ এলো।লাশ পোষ্টম্যার্টাম করার জন্য নিয়ে গেলো।অবশেষে বাবার জায়গা হলো হিম ঘরে। 

কি নির্মম,কতটা যন্ত্রণার।তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশে বজ্রপাত হচ্ছে। মনে হচ্ছে সব বজ্রপাতগুুলো আমাকে ছোবল দিচ্ছে। ভাবছি আর মনের মধ্যে জিজ্ঞাসার বৃষ্টি হচ্ছে। 

আমি কে?কি আমার পরিচয়? আমি কি একজন বাবা?তাহলে আমার জায়গা হবে কোথায়? সম্পদ থাক বা না থাক আমি তো বাবা।আমার জায়গা কোথায় হবে হিম ঘরে নাকি পরম যত্নে কবরে। 

 মাঝেই সম্বিত ফিরে পেলাম। এটাও তো দেখি।রিকশা চালিয়ে সন্তানকে বি, সি,এস ক্যাডার বানিয়েছে পিতা। ঝিয়ের কাজ করে বিচারক বানিয়েছেন সন্তানকে মাতা।যে আদালতে কন্যা বিচারকের চেয়ারে বসেছে সেই আদালতের সামনেই বাবার চায়ের দোকান। 

শিক্ষা সমাপনীর অনুষ্ঠানে সন্তান  পিতাকে মঞ্চে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেয় এই আমার বাবা রিকশা চালিয়ে আমাকে বি,সি,এস ক্যাডার বানিয়েছেন, এই আমার মা ঝিয়ের কাজ করে আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, আমাদের আদালতের সামনেই বাবার চায়ের দোকান। তখন বাবা মায়ের কি গর্ব।

কিন্তু হঠাৎই আবার প্রশ্নের জালে আমি জড়িয়ে দিশেহারা। তাহলে বিচারকের বাবা মা কেন রেল স্টেশনে  ভীক্ষা করছে? রাস্তায় কেন ফেলে গেছে বি,সি,এস ক্যাডারের মাকে?বৃদ্ধাশ্রমে কেন বড়ো কর্মকর্তার বাবা মা?

তখনও বৃষ্টি হচ্ছে তবে আকাশের মেঘে নয়।আমার চোখে, আমার বুকে।

বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে বাবা গত হয়েছেন। দীর্ঘ অসুস্থ্যতায় নয়।সামান্য এক ঘন্টার অসুস্থ্যতায় বাবা চলে গেলেন আমাকে ছেড়ে। মৃত্যুর যন্ত্রণায় যখন তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তখন সবার সাথেই তার কথা হয়েছিলো।কিন্তু আমার সাথে হয়নি কথা। আমি বলিনি কথা ভয়ে বাবার কষ্ট হচ্ছে, আমি সহ্য করতে পারবো না তায়।

বাবা আমি কথা বলিনি, বাবা আমার বুকে ব্যাথা হয় এখন।বাবা তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি বাবা।তোমার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিলোনা।বাবা তুমি আমার সম্পদ আমাকে মাফ করে দিও বাবা।

বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। পরম যত্নে কবরে শুইয়ে দিলাম আমার সম্পদকে।

কিন্তু এখন বাবার কথা খুঁজে বেড়াই, যদি কথা হতো তাহলে কি বলতেন বাবা?শরীরের প্রতি যত্ন নিও.সাবধানে চলাফেরা করে। আমার জন্য দোয়া করে। 

নাকি বাবা বলতেন আমি মৃত্যু যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও.ডাঃ আনো?

নাকি বলতে বাবা তোমার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ বানাও?

বাবা তুমি চলে গেছো ওপারে, আমি এখনও খুঁজে ফিরি তোমাকে। 

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ আজ পৃথিবীতে ভালো নেই। এই সন্তানই বসবা কলিজার টুকরো। জন্মের পর থেকেই সন্তানের জন্য বাবার অনেক সুখ বিসর্জন দেওয়া শুরু হয়।মায়ের অনেক স্বপ্ন নিতে শুরু করে। কতো আদর যত্নে সন্তানকে ভালো রাখার যুদ্ধ শুরু করে বাবা মা।আর সেই সন্তানের ঘরে জায়গা হয়না বাবা মায়ের। কি নিদারুণ, নিষ্ঠুরতা।

বৃদ্ধ বয়সে বাবা একটা প্রবল ইচ্ছে জন্ম নেয়। রোগে সন্তানকে কাছে পাবে।কষ্টে সন্তানকে কাছে পাবে।অথচ আজ সন্তানের গাড়ি বাড়িতে পিতার মাতার আশ্রয় হয়না।আশ্রয় পায় বৃদ্ধাশ্রমে। 

বাবা-মা তোমরা ওপারেই ভালো আছো। 

পৃথিবীতে বাবা মায়েরা ভালো নেই।

এখন সন্তানেরা বাবাকে সম্পদ ভাবেনা,  সম্পত্তিকে সম্পদ ভাবে বাবা।তায় বাবার লাশের জায়গা হয় হিম ঘরে। 

বাবার অনেক কষ্ট হয় হিম ঘরে। বরফে শক্ত হয়ে যায়।আর তোমরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করা নিয়ে বিবাদ করছো?

ধিক্কার জানাই ঐ সমস্ত বি,সি,এস ক্যাডার সন্তানদের, বিচারকের, বড়ো কর্মকর্তাদের।যারা বাবা মাকে ফেলে যায় রাস্তায়। ষ্ট্যাটাসের দোহায় দিয়ে পিতা-মাতাকে অস্বীকার করে। 

আমি ধিক্কার জানাই ঐ সমস্ত সন্তানদের যারা বাবাকে নয় বাবার সম্পদকৈ বড়ো সম্পদ মনে করে। বাবার লাশে পচন ধরায়,বাবার লাশ হিম ঘরে পাঠায়।

বাবা সন্তানকে বি,সি,এস ক্যাডার নয়,মানুষত্বের ক্যাডার বানাতে চাই।মৃত্যুর পরে অল্প সময়ে করবে শায়িত হতে চাই বাবা।

বাবা তুমি ওপারেই ভালো আছো 

পৃথিবীর বাবারা ভালো নেই। 

সন্তানেরা শোন তোমরাও বাবা হবে একদিন। তোমরাও লাশ হবে। 

বিঃদ্রঃ -বাবা মৃত্যুর সময়ে বাবার পাশে থাকতে পারিনি। আবার বাবার জন্য  দোয়া করবেন। 

 

Comments

You must be logged in to post a comment.